টানা ২৫ বছর ধরে কবর খুঁড়ে যাচ্ছেন কামাল

নীরব এক গভীর রাতে খবর এলো ঢাকা থেকে একটি লাশ আসছে যা ভোরেই কবরস্থ করা হবে। আর সেই গভীর রাতেই একা কামাল কবর খুঁড়ছেন। হঠাৎ সূফী আল্লাহওয়ালা এক হুজুর তার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মিলিয়ে গেলেন। রাত তখন প্রায় ২টা। কামাল বললেন, এদের দেখা মিললেই দোয়া দরূদ পড়তে হয়। তারা কোন ক্ষতি করেন না। দেখা দিয়েই চলে যান।

আরেকবার রাতে কবর খোড়ার জন্য তিনি ঝুড়ি কোদাল নিয়ে বেরিয়েছেন। এক পা ফেলতেই দেখলেন বিশাল এক সাপ লম্বা-লম্বি ভাবে আপন মনে শুয়ে আছে। কামাল দোয়া দরূদ পড়লেন। সাপটি নিমিষেই মিলিয়ে গেলো।অন্য আরেকদিন একটি লাশ কবরস্থ করার পর যখন সবাই চয়ে গেলো। তখন কামালের চোখে পড়লো সরু রাস্তাটির উপরে একটি তরতাজা কংকাল শুয়ে আছে। সাহসী যুবক কংকালটি স্পর্শ করা মাত্রই এক মুঠো ছাই হয়ে গেলো…

এছাড়া প্রায়শই স্বপ্নে নানা আজব ঘটনা দেখে থাকেন কামাল। একদিন কামাল স্বপ্নে দেখলেন একটি ট্রেনে কথা বলতে পারা কাটা শরীরের উপরিভাগ একটি লাশ তিনি দাফন করছেন, লাশটি তাকে কবরস্থ না করার জন্য চিৎকার করে অনুরোধ জানাচ্ছে, তৎক্ষনাত ঘুম ভেঙ্গে গেলো কামালের।এরকম অসংখ্য ঘটনা প্রতিটি কবরস্থানে প্রায় প্রতিদিন প্রতিরাতেই ঘটে যাচ্ছে কিন্তু সহসাই যা আমাদের চোখে পড়ে না। এমন অনেক চাক্ষুস বেশ কয়েকটি ঘটনা দেখেছেন কামাল যা সহজে তিনি বলতে চাননি। তবে অনেক পীড়াপীড়িতে বাংলাদেশ জার্নালের প্রতিনিধির কাছে এই কয়েকটি ঘটনা বলছিলেন কামাল।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন আওতাভূক্ত কালীবাড়ী কবরস্থানের কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ৩৮ বছর বয়সী কামাল হোসেন। পিতা মরহুম ফজর আলীও আমৃত্যু এই কাজটি করে গেছেন। এক রকম পৈত্রিক সূত্রে কামাল হোসেন দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করে যাচ্ছেন।
কখনও ভয়, কখনও উৎকণ্ঠা, কখনও একটি ভাল কাজ করার প্রণোদনা। সবসময়ই এই কাজ করতে গিয়ে তাকে ঘিরে রাখে। প্রথমদিকে পরিবার থেকেও তাকে নিষেধ করা হতো। কিন্তু কোথায় জানি একটা আধ্যাত্মিক চেতনা সম্মোহিত করে তাকে।

তাই কালীবাড়ী গোরস্থানে কর্মরত কামাল হোসেন নিস্তব্ধ অমাবশ্যা অথবা পূর্ণিমার গভীর রাত; ছনমনে দুপুর যখনই ডাক আসতো তিনি জায়গা বেছে কবর খোঁড়ার কাজে লেগে যেতেন। এ সময় ভয় ভয় লাগতো কিন্তু একটা অলৌকিক সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন কামাল।তখন তার মনে হতো ভয় বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই। এছাড়া কামাল মনে করেন ও তার ভাবনায় আসে তিনি একটি সর্বোত্তম ফরজ কাজ আদায় করছেন যা মৃত্যু পরবর্তী মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক তাকে পুরস্কৃত করবেন।

এ ব্যাপারে একাধিক মুফ্তি এবং আলেমদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একজন মূর্দ্দাকে যদি, সহিভাবে কবরে শায়িত করা হয় তবে সেই কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ব্যাক্তিকে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা আল্লাহ পাক্ নিশ্চিত করেছেন। কবর খোঁড়ার কাজ যতক্ষণ চলতে থাকে এবং কবরে শায়িত করে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহ পাকের তরফ থেকে অসংখ্য ফেরেশতা সেই কবরটি ঘিরে রাখেন যা মানবকূল দেখতে পান না।কামাল জানায়, মাত্র ৯০০ টাকা সম্মানী ভাতার মাধ্যমে তিনি কাজ শুরু করেন। বর্তমানে মাসিক সম্মানী ভাতা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১০০ টাকা। স্ত্রী ও চার ছেলে মেয়েসহ কালীবাড়ী বাস্তুহারা সমিতির একটি ঘরে কোন মতে সংসার চলে তার।

আগে ছেলে-মেয়েরা নগরীর সুনামধন্য মুকুল নিকেতনে পড়াশুনা করতো কিন্তু অর্থাভাব আর টানা পোড়েনে সেখান থেকে ছাড়িয়ে অন্যত্র লেখাপড়া করছে সন্তানেরা।প্রথমে এই কাজে আসতে প্রচন্ড বাধার সম্মুখিন হয়েছিলেন কামাল। কিন্তু জীবন সংগ্রামে উপায়ন্তর না দেখে ভয়ে ভয়েই কাজটি শুরু করেন তিনি। এখন আর ভয় লাগে না তবে সিটি করপোরেশন ভূক্ত কর্মচারী হিসেবে কামাল জানান, এই স্বল্প বেতনে সংসার চলে না, তিনি বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

কামাল আরও জানান, এই জীবনে অন্তত ৪ হাজার লাশের কবর খুঁড়েছেন তিনি। শুকনো দিনে একটি কবর খুঁড়তে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লেগে যায়। আর বর্ষার দিনে আরও বেশি সময় লাগে।কামালের মতে, তিনি ভয় পান ট্রেনে কাটা লাশ মৃতদেহ দেখে কারণ। লাশগুলো একেবারেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। তবে কামাল সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলেন বছর দশেক আগে গলগন্ডায় ট্রেনে আত্মহত্যার ৯ লাশের কবর খুঁড়তে গিয়ে। এ সময় তিনি এতোটাই বিমর্ষ হয়েছিলেন যে কবর খোঁড়ার কাজ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন।

তবুও মৃত্যুর পর হয়তো একটি পুরস্কারের প্রাপ্তির আশায় কামাল হোসেন আজও কবর খোঁড়ার কাজ করে যাচ্ছেন। যা অন্য কারোর মাধ্যমে এই কাজ করা সম্ভব নয়।ময়মনসিংহ শহর এবং শহরতলীতে অনেক কবরস্থান রয়েছে বলে জানা গেলেও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের স্যানেটারী ইন্সপেক্টর দীপক মজুমদার জানান, দশটি কবরস্থান করপোরেশনের অধীনে রয়েছে। এগুলো তত্ত্ববধান করা হয়। তিনি জানান, বেতন ভাতাদি যদিও এগুলো বর্তমানে সম্মানী ভাতা হিসেবে দেয়া হচ্ছে তবে মূল বেতনে প্রবেশের ব্যবস্থাটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জানা গেছে, দশটি গোরস্থানের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ সিটি করপোরেশন করে থাকে। তবে কালীবাড়ী গোরস্থানের কামাল হোসেন জানান, প্রায় প্রতিদিনই তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে বিভিন্ন কবর পরিস্কার করে যান যা সওয়াবের বশবর্তী হয়েই তিনি করে থাকেন।

ময়মনসিংহ সিটি বাসীর প্রত্যাশা ময়মনসিংহ শহরের সকল গোরস্থানই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং আলোকিত থাকুক। এবং কামাল হোসেনের মত ধ্যানী ও প্রচন্ড ধার্মিক ব্যাক্তিরা কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত থেকে কবরস্থানগুলোকে আলোকিত করে রাখুক।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত