পরকীয়া

নিয়মিত প্রার্তভ্রমনে যান মিনহাজ(ছদ্মনাম)। পার্কে নানা বয়সী স্বাস্থ্য পিপাসু নারী-পুরুষের ভিড়।এর মধ্যে হঠাৎ একদিন এক নারীকে দেখে চমকে উঠলেন মিনহাজ।প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ে যাওয়ার বয়স পেরিয়ে এসেছেন অনেক আগে।কিন্তু তাঁর চেয়ে দু-চার বছর কম বয়সের দীর্ঘাঙ্গী নারীর সুন্দর মুখশ্রী আর হেঁটে যাওয়ার ঋজু সাবলীল ভঙ্গী কেন জানি হাহাকার জাগিয়ে তুলল বুকের ভেতর।তার নিজের স্ত্রীও সুন্দরী।তুলনা টানার ইচ্ছা ছিলনা।তবু ভোরে বিছানা ছেড়ে আসার সময় আলুথালু বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকা স্ত্রীর সংসারক্লান্ত উদ্যমহীন যে চেহারাটি দেখে এসেছিলেন তা মনে পড়ে।বড় একঘেয়ে সে দৃশ্য। পার্কে ঘুরতে আসা নারীকে দেখে তাই যেন নিভে আসা সলতেটি আগুনের উসকানি পায়।

অন্যদিকে,পুরুষের চোখে মুগ্ধতার ভাষা পড়তে পারেন না এমন নারীতো ইহজগতে নেই।মিনহাজের দৃষ্টি চিনতে অসুবিধা হয়নি ফারিহারও(ছদ্মনাম)। নিজের স্বামীর চোখেও এই আগুন তো দেখেছিলেন কোন এককালে,এখন তা নির্বাপিত। এখন ভদ্রলোকটি যেন একবার চোখ তুলে তাকানোর আগ্রহও হারিয়েছেন।তাই মিনহাজের দৃষ্টি শিহরিত করে তাঁকেও।এখনো ফুরিয়ে যাননি তিনি,এই বোধ নতুন আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।এই দুটি অভিজ্ঞ নর নারী পরিচয় পেরিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে সময় লাগে না।মধ্যবয়সের এই সম্পর্ককে সম্পর্ক না বলে সংকট বলাই সংগত।

মনোবিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন মধ্যবয়সের সংকট বা মিডএজ ক্রাইসিস।পরিণতি হয়তো একেকজনের জীবনে একেক রকম।গল্প উপন্যাসে এ ধরনের সম্পর্কের কথা লেখা হয়েছে অজস্র।সাহিত্য তো আকাশচারী কল্পনা নয়,জীবনের প্রতিচ্ছবি।

সমাজের কিছু নিয়ম শৃঙ্খলা আছে।কিন্তু মানুষের মধ্যে হৃদয় নামের যে অদৃশ্য বস্তুটি আছে,তা সব সময় নিয়ম মেনে চলতে পারে না।কখন দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায়, ‘হেথা নয় হেথা অন্য কোনখানে’ ধরনের এক ভাব এসে উন্মনা করে তোলে হৃদয়,তার ব্যাখ্যা দেবে কে?আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে এই সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।যোগাযোগ সহজ।রুটিন বাঁধা জীবনে হতাশ দুজন নারী পুরুষ ভার্চ্যুয়াল জগতে খুজে পায় একে অপরকে।কৌতূহল থেকে অনুসন্ধান,ইনবক্সের আলাপচারিতা থেকে যোগাযোগের পর্ব দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে ঘনিষ্ঠতায়।এই ‘অবৈধ’ সম্পর্কে জরিয়ে এতদিনের নিরাপদ জীবন ও সোনার সংসারটা যেন তুচ্ছ হয়ে যায়।ঘটনা প্রকাশ পেলে চড়া মূল্যও দিতে হয়।সমাজের কাছে হেয়,স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানের চোখে নিচু হতে হয়।পরিণতি হতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে নানা রকম।কখনো সুখের সংসার ভেঙ্গে তছনছ,ছেলেমেয়ের ভবিষৎ অনিশ্চিত,সঙ্গীনি তার প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নেই অনেকে।

কিছুদিন আগে যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া পরে যায় ডঃআকাশের কথা।হয়ত তার কথা আমরা জানতে পেরেছি মিডিয়ার মধ্যমে।কত আকাশের খবর আমরা জানতেই পারিনা,থেকে যায় অজানাই।আমাকে আমার খুব কাছের একজন রিকোয়েস্ট করেছে পরকীয়া সম্পর্কে একটা পোস্ট লিখতে।তার জীবনটাও পরকীয়ার বিষাক্ত ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে,সাথে সাথে তার সন্তানদেরও ভবিষৎ অনিশ্চয়তার দিকে।তার স্বামী অন্য আরেকজনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে,আর এদিকে সে দুঃখের সাগরে ভেসে যাচ্ছে। যাইহোক যা বলতেছিলাম, যদিও কখনো আপাত মীমাংসার পথ ধরে মুখরক্ষা।কিন্তু ক্ষত শুকায় না।ছাইচাপা আগুন জীবনভর জ্বলতে থাকে।এ রকম এখন শুধু বিবাহিতদের ক্ষেত্রেই হচ্ছেনা অনেক অবিবাহীতদের ক্ষেত্রেও হচ্ছে তারা একটার পর একটা প্রেমিক প্রেমিকা পরিবর্তন করছে।পরকীয়া একটা ব্যধি,কি নাম দেব এই রোগের? মনোবিজ্ঞানের মতে এটা একটা তীব্র মানসিক রোগ।আমি বলি শুধু মানসিক রোগই নয়,এটা একটা সামাজিক ব্যাধিও।ক্যান্সারের মত একটা মারাত্মক ব্যাধি।ছেয়ে যাচ্ছে বিশ্বের আনাচে কানাচে।এটা মাদকের চেয়েও ভয়াংকর।এই ব্যাধিতে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য সোনার সংসার।অনেকে আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজ প্রানটুকু দিয়ে বসে।জীবন চলার পথে স্বামী স্ত্রী ছাড়াও অন্য কাওকে ভাল লাগতে পারে এটা স্বাভাবিক এই ভাললাগাটা ভালবাসায় রুপ দেয়া বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।জীবন চলার পথে আবেগ থাকাটা দূষনীয় কিছু নয়।তবে আবেগটাকে বিবেক দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।আমি আগেও একটা ছোট একটা লেখা পোস্ট করেছিলাম ‘আবেগ নামক গাড়িকে যদি বিবেক নামক স্টিয়ারিং দ্বারা কন্টোল করা না যায় তবে ঘটে মহাবিপদ’।

আসুন আমরা পরকীয়াকে মাদকের মত না বলি।আর এরকম কিছু হলে আপনি নিজেকে চিকিৎসা করান।আজকাল কাপল কাউন্সেলিং বা ম্যরিটাল কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেও চিকিৎসকেরা সহজ সুন্দর পথ বাতলে দেন।আর আমি বলি সবার উপরে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলোন।এই গুণগুলো না থাকলে সমাজে আপনি মানুষ হিসাবে নিজেকে কিভাবে পরিচয় দিবেন ? এই গুণগুলোই কুকুর ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য।সেই কোণকালে বম্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ধরনের সম্পর্ককে বিষবৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন।তার বিষবৃক্ষ উপন্যাসের শেষ পঙ্ক্তিটি ছিল-আমরা বিষবৃক্ষ সমাপ্ত করিলাম।ভরসা করি,ইহাতে গৃহে গৃহে অমৃত ফলিবে।কিন্তু তার সে আশা কি পূর্ণ হয়েছে?বরং আমরা তা দেখেছি বিষবৃক্ষটি পুষ্প পত্র পল্লবে আরও উচু করে দাড়িয়ে আছে।আসুন আমরা নিজেও এই পরকীয়া বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচি, অপরকেও বাচাতে সাহায্য করি।শেষ করছি নচিকেতার গানের একটা লাইন দিয়ে।বউ/স্বামীকে লাগতে ভাল আগেরই মত দৃষ্টিভঙ্গিটা শুধু বদলাও।

কে এম জাফর সাদেক
নিলক্ষ্যা,রায়পুরা,নরসিংদী।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের নির্বাচিত আরও

দানবের জন্ম

পাঠকের মতামত