রোহিঙ্গা বলে শিক্ষার অধিকারও জুটবে না : প্রশ্ন সেই তরুণীর

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা তরুণী রহিমা আক্তারের উচ্চশিক্ষা হু’মকির মুখে। তার নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক ওঠায় কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তার ছাত্রত্ব স্থগিত করেছে। রহিমা আক্তার এখন কক্সবাজরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা এপি রহিমাকে নিয়ে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ এরপরই তার নাগরিকত্ব নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। প্রতিবেদেনে রোহিঙ্গা তরুণী হিসেবে তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয় এবং বলা হয় ১৯৯২ সালে তার পরিবার মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে। সে আরো উচ্চ শিক্ষা নিতে চায় বলেও জানায় এপিকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার খন্দকার এহসান হাবিব জানান, ‘‘সে আমাদের প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবেই ভর্তি হয়েছে৷ তার জন্ম নিবন্ধন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে নেয়া। কিন্তু এখন তার নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক ওঠায় আমার তার ছাত্রত্ব স্থগিত করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রমাণ না হলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের(ইউজিসি) মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবো।”

তিনি আরে জানান, ‘‘সে আমাদের এখানে ভর্তি হওয়ার আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি এবং কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। সেই সব ডকুমেন্টও আমাদের কাছে জমা দিয়েছে।” রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে রাহী খুশিকে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই ক্যাম্পের মুখপাত্র ইউনূস আরমান জানান, ‘‘তার পরিবার ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে৷ তবে রহিমার জন্ম কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।”

এদিকে দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর বন্ধুসভার জেলা কমিটির অর্থ সম্পাদকের পদ থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে রহিমাকে।

দৈনিকটির কক্সবাজার প্রতিনিধি আব্দুল কুদ্দুস রানা জানান, ‘‘সে বন্ধুসভার জেলা কমিটির অর্থ সম্পাদক ছিলো। কমিটির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত৷ যেহেতু তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাই তাকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কারণ বাংলাদেশি নাগরিক এমন ছাত্র-ছাত্রীরাই কেবল বন্ধুসভার সদস্য হতে পারে।”

সব মিলিয়ে বেশ বিপর্যয়ের মুখে রয়েছেন রহিমা ও তার পরিবারের সদস্যরা। রহিমা তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছেন। স্থানীয়ভাবে লোক পাঠিয়েও তাদের পরিবারে কাউকে রোববার কুতুপালং ক্যাম্পে পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে তারাও বিষয়টি তদন্ত করছেন। রহিমা যদি বাংলাদেশের নাগরিত্ব প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে তার এসএসসি এবং এইচএসসি’র সনদও বাতিল হতে পারে।

ইউজিসি’র ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মাকসুদুর রহমান ভুঁইয়া জানান, ‘‘বিদেশিরা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেন। তবে এজন্য তাদের ওয়ার্ক পারমিট এবং ওই দেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগে। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সেই সুযোগ নেই।”

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পড়াশুনার জন্য ক্যাম্পের মধ্যে স্কুল আছে। সেই স্কুলে এখন কেবল অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিশুরা পড়াশোনা করতে পারেন৷ তবে সেখানে বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করানো হয়না। আর এনজিও পরিচালিত এই শিক্ষার বাংলাদেশে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।”

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘শিক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার৷ রাষ্ট্রহীন নাগরিক হলেও তার এই অধিকার কেড়ে নেয়া যায় না। আইন প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে হবে, যাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা এখানে স্বাভাবিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা নিতে পারেন৷ শিক্ষা টিনের বাক্সে বন্দি করে রাখা যায় না।”

রহিমার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘সে যেভাবেই শিক্ষা গ্রহণ করুক না কেন, যে পরিচয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক না কেন, তার পড়াশোনাকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না৷ তাহলে তার প্রতি অন্যায় করা হবে৷ কারণ শিক্ষা গ্রহণে কোনো মানুষকে বাধা দেয়া যায় না৷”

রহিমা যাতে তার পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান এই মানবাধিকার কর্মী।

তবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকারও সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে খবর পরিবেশনে সংবাদ মাধ্যমের আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কোনো সমস্যার কথা বলতে গিয়ে সে সমস্যার শিকার কাউকে বিপদে পড়ে এমন সংবাদ প্রচরে করার আগে ভাবা উচিত।”

কুতুপালং ক্যাম্পের মূখপাত্র ইউনূস আরমান বলেছেন, ‘‘আমরা লেখাপড়ার সুযোগ পাইনা, এটা অমানবিক। অষ্টম শ্রেণির পর আমরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হই। আমাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকা উচিত।” রহিমাকে তার উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত