Bangladesh News24

সব

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বাড়াতে হবে

গাজীউল হাসান খান

মূল আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করলেও উনিশ শতকের খ্যাতনামা সাহিত্যিক-সাংবাদিক অস্কার ওয়াইল্ড অক্সফোর্ডের বাইরে তাঁর ক্ষুদ্র জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন লন্ডনে। ভিক্টোরিয়ান আমলের এই জ্ঞানতাপসের লেখনী, নৈতিকতাবোধ ও জীবনদর্শন শুধু যুক্তরাজ্যে নয়, সমগ্র ইউরোপের সমাজব্যবস্থায় এক প্রগতিশীল ধারার সূচনা করেছিল।
ইউরোপের পুনর্জাগরণ ও শিল্পবিপ্লবের চিন্তা মাথায় রেখে অস্কার ওয়াইল্ড ধনতন্ত্রের বিকাশ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন আঙ্গিকে অনেক দিকনির্দেশনামূলক রচনা ও আলেখ্য প্রকাশ করেছেন, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে হয়েছে। একজন বিনীত লেখক-সাংবাদিক হিসেবে আমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকে, আমার তৎকালীন সহপাঠীদের অনেকে ভাবাদর্শগতভাবে অস্কার ওয়াইল্ডের অনুরাগী হয়ে উঠেছিলাম। এক আদর্শ মানবসমাজ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, সম্পদ দিয়ে নয়, গুণ দিয়েই মানুষের পরিচয় হতে হবে। তার জন্য চাই এমন এক সমাজব্যবস্থা (ওয়াইল্ডের মতে সমাজতন্ত্র), যা ব্যক্তিগত সম্পত্তির দাসত্ব, স্বার্থপরতা ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা থেকে মানুষকে মুক্তি দেবে। সে অবস্থায় ব্যক্তির পরিচয় হবে তার গুণাবলি ও কর্মক্ষমতা দিয়ে। তিনি বলেছেন, ব্যক্তির মানবিক বিকাশের জন্যই এ ব্যবস্থা দরকার। তাতে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আসবে সহনশীলতা, শান্তি ও স্থিরতা, পাশাপাশি রাষ্ট্র থেকে অন্যায় ও অপরাধপ্রবণতা কমে যাবে। আমাদের রাজনীতিবিদরা সেগুলো ভালো করেই বোঝেন। কিন্তু তাঁরা সব জেনেও সে পথে হাঁটবেন না। কারণ তাঁদের মধ্যেও যে প্রভূত সম্পদ অর্জনের অনিয়ন্ত্রিত লোভ বা লালসা কাজ করছে। আমাদের সংবিধানে সমাজতন্ত্র কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার শব্দটি সন্নিবেশিত করা হলেও রাষ্ট্রীয় নীতি কিংবা আদর্শিক পরিমণ্ডল থেকে তাকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য মুক্ত অর্থনীতির কোনো বিকল্প নেই, এমন নয়। তবে আমরা তা চাই কি না সেটিই হচ্ছে আসল কথা। মুক্তবাজার অর্থনীতি অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত চীন কিংবা ভারতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অবকাঠামোগত বিনির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে বেশ সহায়ক হলেও তা শেষ পর্যন্ত যে সমাজের নিচুতলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

গণচীনে একদলীয় শাসন পদ্ধতি, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন ও সর্বোপরি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার প্রচেষ্টা তুলনামূলক কঠোর বলে বাজার অর্থনীতির সাফল্য বেশ কিছুটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সেটি আবার জন্ম দিয়েছে এমন এক নব্য পুঁজিপতি গোষ্ঠীর, যারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পদ অর্জনের লড়াইয়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধের দেয়াল ডিঙিয়ে যেতে সদা ব্যস্ত। সোভিয়েত পদ্ধতি অবসানের পর আজকের রাশিয়ায় তা অত্যন্ত জাজ্বল্যমান হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ধনিক শ্রেণির তুলনায় নব্য রুশ ধনিক শ্রেণি এখন দুবাই, সিঙ্গাপুর, লন্ডনসহ বিভিন্ন বড় ব্যবসাকেন্দ্রে তাদের সম্পদ পাচার ও বিনিয়োগে অত্যন্ত ব্যস্ত রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শাসকশ্রেণি যে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে, তা-ও নয়। ক্রমেই এসবের প্রভাব থেকে গণচীনের সম্পদশালীরা যে মুক্ত থাকবে, তা নয়। ভারতের ধনিক শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সঙ্গোপনে তাদের সম্পদ পাচার ও বিদেশে মূল্যবান সম্পত্তির মালিক হওয়ার চেষ্টা করছে; তাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্প-কারখানা ক্ষতির সম্মুখীন হলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। দেশের নিচুতলার বেশির ভাগ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি তাই এক কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বের অনেক প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদ এখন নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদের পরিবর্তে মানবিক অবয়বসম্পন্ন এক সামাজিক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তোলার সুপারিশ করে যাচ্ছেন, যা বিশ্বকে অদূর ভবিষ্যতে এক মহাবির্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেশ কিছু বছর ধরে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই জনবান্ধব ‘সামাজিক ব্যবসা’ চালু করা, মুক্তবাজার অর্থনীতির দৌরাত্ম্য ঠেকানো এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসা শোষণ-বঞ্চনার বিস্তার রোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রগতিশীল ধারার অর্থনীতিবিদ যথেষ্টই রয়েছেন। তবে এক শ্রেণির মানুষের রাজনৈতিক আধিপত্য, লুটপাটের প্রক্রিয়া (সিন্ডিকেট গঠন ইত্যাদি) ও তাণ্ডবের প্রেক্ষাপটে তাঁরা অনেকটা কোণঠাসা, নিষ্প্রভ ও নিস্পৃহ হয়ে টিকে আছেন। তাঁদের পরামর্শ কিংবা ব্যবস্থাপত্রের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তেমন কোনো মূল্য নেই। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র পূর্বাপরই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক গবেষক, পরামর্শদাতা ও বিশেষ করে ‘থিংক ট্যাংক’-এর ব্যাপারে অত্যন্ত বিরূপ ধারণা পোষণ করে। এক কথায় বলা যায়, শাসকশ্রেণি উল্লিখিত গোষ্ঠীর ব্যাপারে অত্যন্ত ‘অ্যালার্জিক’। শাসকশ্রেণির কর্তাব্যক্তিদের ধারণা, উল্লিখিত গোষ্ঠীটিও বিভিন্ন স্বার্থের প্রশ্নে কারো না কারো প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে সহজেই একটি লেবেল এঁটে দেওয়াও অসম্ভব নয়।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. সিরাজুল ইসলাম বহু দিন আগে তাঁর একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন যে পরিকল্পিত অর্থনীতি মানেই কিন্তু সমাজতন্ত্র নয়। কেননা পরিকল্পিত অর্থনীতি আমলাতন্ত্রকে পুষ্ট করতে পারে। গণতন্ত্র আমলাতন্ত্রকে সহ্য করে, সমাজতন্ত্র নয়। যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র ক্রমেই শিকড় বিস্তার করে গেড়ে বসে, তার পরিণতি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো হতে বাধ্য। বাংলাদেশের বর্তমান অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ, অপরিপক্ব ও অদূরদর্শী আমলাতন্ত্র নিজ অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে খুব তাড়াতাড়িই শাসকগোষ্ঠীর তাঁবেদারে পরিণত হতে বাধ্য হয়। কারণ নিজ যোগ্যতা দিয়ে তাদের অবস্থান ধরে রাখা মোটেও সম্ভব হয় না। সে কারণেই অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। ঢাকার কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ও ঋণ প্রদানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই সংকটে পড়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। সরকারি ব্যাংকগুলোর এ চরম দুরবস্থার মূল কারণ হচ্ছে জবাবদিহির অভাব। অনিয়ম ও দুর্নীতি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ব্যাংকগুলোতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। তবে তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানা গেছে। অনেকে ধারণা করছেন, ঋণের টাকার উল্লেখযোগ্য অংশ এরই মধ্যে দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনে যারা জড়িত, এখনই তাদের চিহ্নিত করার সময়। তা ছাড়া ব্যাংকের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যাংকিং খাতে বিস্তারিত সংস্কার প্রয়োজন বলে দেশের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের ধারণা। তাঁদের অভিযোগ, দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তেমনি কোনো নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমতা নেই নতুন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া বা আটকানোর ব্যাপারে। সরকার যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকটিকে সাজিয়ে রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ঘোষণার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে জমা রাখা বাংলাদেশের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে গেল অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার কেউ তার খবরই রাখেনি। সামনে আসছে নির্বাচন। পদ্মা সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ দেখিয়ে বাহবা কুড়িয়েছে। ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন খাতে এখন খুঁজে বের করতে হবে লোপাট করা ব্যাংকের ঋণ গেল কোথায়? কারা দেশীয় ঋণের অর্থে বিদেশে ‘সেকেন্ড হোম’ কিনেছে। বিদেশে কাদের কী কী সম্পদ রয়েছে এবং তাদের ছেলেমেয়েরা কার পাঠানো অর্থে পড়াশোনা কিংবা বসবাস করছে। ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে সরকার একটি ‘ব্যাংকিং রিফর্ম কমিটি’ (বিআরসি) গঠন করেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল খেলাপি ঋণের টাকা আদায় করা, ব্যাংকের আয় বাড়ানো ও খরচ কমানো, ব্যাংক কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত সেবা প্রদাণের যোগ্য করে তোলা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি। কিন্তু তা এত দিনেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারল না কেন?

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

gaziulhkhan@gmail.com

image-id-677552

বিপজ্জনক পথে সৌদি আরব

image-id-677529

বিচারক, বিচারব্যবস্থা ও গণতন্ত্র

image-id-676985

সশস্ত্র বাহিনী দিবস একাত্তর থেকে ২০১৭

image-id-676407

কেমন হবে আগামী সংসদ নির্বাচন

পাঠকের মতামত...
image-id-676179

মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে শিয়াপন্থী ইরান ও লেবাননের...
image-id-675051

স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন

শপিং মলের খোলা জায়গায় একটি সুন্দর বসার জায়গা। সেখানে তের...
image-id-674870

নিখোঁজ বা অপহৃতদের খুঁজে বের করতে হবে

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। অনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেক আত্মত্যাগে অর্জিত ১৯৭১ সালের...
image-id-674580

মধ্যপ্রাচ্য কি ধ্বংসের শেষ প্রান্তে?

বাঙালি কেচ্ছাপ্রিয় জাতি। বাঙালি হিসেবে আমি নিজেও কেচ্ছা-কাহিনী শুনতে ভালোবাসি।কারণ...
image-id-677924

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে অনুদান নেইনি: খালেদা জিয়া

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে অনুদান গ্রহণের সঙ্গে কোনভাবে সম্পৃক্ত...
image-id-677921

৪ বছরের শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা!

ধর্ষণ এমন এক ব্যাধি যা সংক্রমণের মত ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের...
image-id-677914

রাজত্ব নয়, মানুষের ভালোবাসা পেতে এসেছি : আরিফিন শুভ

‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমার পর সাফল্যের ডানায় চড়ে দেশের বাইরে তিন...
image-id-677908

কাঠমিস্ত্রীর ছেলে থেকে যেভাবে জিম্বাবুয়ের শাসক হলেন মুগাবে!

তীব্র জনরোষে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন জিম্বাবুয়ের শাসক...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2017
Published by bdnews24us.com
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com