ট্রাম্পের দেয়াল, শাট ডাউন ও অভিশংসনপ্রক্রিয়া

পুরনো বছরের শেষ এবং নতুন বছরের শুরুটা পশ্চিমা জনজীবনে ছুটি কাটানোর এক আনন্দঘন সময়। একদিকে খ্রিস্টীয় বড়দিন এবং অন্যদিকে নববর্ষ উদ্যাপনের সুবর্ণক্ষণ। এবং নিজের স্বার্থ আদায়ের জন্য ঠিক সে সময়টাই বেছে নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে একটি সুউচ্চ দেয়াল নির্মাণের জন্য কংগ্রেসের কাছে বিশাল অঙ্কের অর্থ চেয়ে বসলেন তিনি। কিন্তু বর্তমান কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিরোধী ডেমোক্রেটিক দল প্রেসিডেন্টের সে আবদার মেটাতে নারাজ। কারণ তাঁদের মতে প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা অবাস্তব এবং কোনোমতেই যুক্তিসংগত নয়। তখন সে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেডারেল সরকারের অধীনে কর্মরতদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়টি। প্রেসিডেন্ট এবং ডেমোক্রেটিক দলের বিরোধে সৃষ্ট জটিলতায় যে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল তা জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই প্রায় এক মাস পূর্ণ হওয়ার পথে ছিল। এ গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে ফেডারেল সরকারের প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো বেতন-ভাতা পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা ‘শাট ডাউন’। এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত সে বিরোধের অবসান ঘটেনি।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসের দ্বিতীয় কক্ষ অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া ডেমোক্রেটিক দলের সদস্য ও উচ্চকক্ষে নির্বাচিত সিনেট সদস্যরা ১১৬তম কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন নতুন বছরের ৩ জানুয়ারিতে। এরই মধ্যে রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিরোধী ডেমোক্রেটিক দলের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ চরমে পৌঁছেছিল। অবশ্য এর সূত্রপাত হয়েছিল ট্রাম্পের বহু বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের তুলনায় প্রথম দুই বছরের মাথায়ই সবচেয়ে বিতর্কিত এবং অজনপ্রিয় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দুর্নাম কুড়িয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, তাঁর (ট্রাম্প) জনপ্রিয়তার হার প্রথম বছরের পর থেকে চল্লিশের কোটার নিচে নেমে গিয়েছিল। এ অবস্থা পরিবর্তনের আর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে। অন্যান্যের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের বিরোধ বেধেছে দেশের দক্ষিণে অর্থাৎ মেক্সিকো সীমান্তজুড়ে একটি সুউচ্চ দেয়াল বা প্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে। এটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, যা হয়ে উঠেছিল দেশব্যাপী তাঁর শ্বেতাঙ্গ সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ট্রাম্পের ধারণা, মেক্সিকো থেকে আসছে অগণিত অবৈধ মানুষ। তাদের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদক চোরাচালানের পরিমাণ। তা ছাড়া সে অবৈধ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের চাকরিবাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করে নিচ্ছে। সেসব অবৈধ অভিবাসীর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে খুন, ধর্ষণ ও মাদক ব্যবসাসহ অসামাজিক কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে ট্রাম্পের অভিযোগ। সুতরাং তাদের রোধ করতে দেশের দক্ষিণের সীমান্তজুড়ে একটি উঁচু ও স্থায়ী দেয়াল নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের সে অভিযোগকে অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করে সে কথিত দেয়াল নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দিতে অস্বীকার করেছেন। মূলত তা থেকেই অচলাবস্থার সূচনা।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক বিরূপ মনোভাব ও প্রতিক্রিয়া বহু কারণে সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাহীন ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপরিচালনায় সম্পূর্ণ অযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেননি ট্রাম্প। তিনি ক্ষমতায় এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে। ট্রাম্পের তুলনায় ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন প্রায় আড়াই মিলিয়ন ভোট বেশি পেয়েছেন। তা ছাড়া সে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপক কারচুপি করেছেন বলে ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ। সে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার ষড়যন্ত্র ও ব্যাপক সাইবার কারসাজিতে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল বলে তাদের ধারণা। ডেমোক্র্যাটদের মতে ট্রাম্প একজন চরিত্রহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ও অনুপযুক্ত ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তাঁর নেই। তা ছাড়া ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ’, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও তথাকথিত আমেরিকান জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবেও ডেমোক্র্যাটরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছে। এ অবস্থায় সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পই যখন মেক্সিকো সীমান্তজুড়ে দুই হাজার মাইলব্যাপী একটি সুউচ্চ স্টিলের প্রাচীর নির্মাণ করার জন্য ডেমোক্র্যাটদের কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ বরাদ্দ চান, তখন অবস্থা যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ কিংবা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে এ ধরনের বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে প্রস্তুত নয় ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনে কারচুপির কারণে অভিশংসনে না পড়লে দ্বিতীয় টার্মে নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য সে প্রস্তাবিত দেয়াল নির্মাণ ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিনি জানেন যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ ভোটারের সমর্থন পেলে কেউ তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে সুউচ্চ প্রাচীর বা দেয়াল নির্মাণ করার ইস্যুটি অতিসাধারণ কিংবা সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন শ্বেতাঙ্গদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যাপার।

ডেমোক্র্যাটরা সীমান্ত নিরাপত্তার বিরোধী নয়। তাদের বক্তব্য হলো, মেক্সিকো সীমান্তের দুই হাজার মাইলজুড়ে দেয়াল নির্মাণ করে পরিবেশ বিপর্যয় না ঘটিয়ে উত্কৃষ্ট নজরদারি প্রযুক্তি ও সীমান্তের বিভিন্ন প্রবেশপথে খরচ বাড়াতে হবে। উন্নত টহলদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাতে অবৈধ অভিবাসন, মানুষ ও মাদকপাচার কমে যাবে। সীমান্ত প্রহরী ও ড্রোন ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ করে নজরদারি বাড়াতে হবে। তা না হলে শুধু দেয়াল নির্মাণ কোনো কিছুই প্রতিরোধ করতে পারবে না। কারণ দেয়ালের নিচ দিয়ে টানেল বা সুড়ঙ্গ নির্মাণের মাধ্যমে বেআইনি কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা আরো সহজ হবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত রিপাবলিকানরা তা মানতে রাজি নয়। কারণ আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে একটি দেয়াল নির্মাণ করে ট্রাম্পের ভোটারদের দেখাতেই হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে সুদীর্ঘ সীমান্তজুড়ে দেয়াল বা স্টিলের বেড়া নির্মাণ করতে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। কিন্তু তাতে কোনো অর্থবহ ফল পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া জলাশয় কিংবা অসমতল অঞ্চলে দেয়াল বা বেড়া নির্মাণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু ট্রাম্প মানছেন না সেসব যুক্তি। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, টেক্সাস ও ফ্লোরিডাসহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তহবিলে জমা আছে। সে অর্থ অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, সে অর্থ দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দক্ষিণ সীমান্তে দৃষ্টিনন্দন দেয়াল নির্মাণের জন্য নয়। কিন্তু ট্রাম্প জেদ ধরেছেন অর্থ বরাদ্দ দিতেই হবে। এবং তাঁর একটি দেয়ালও নির্মাণ করতে হবে। নতুবা তিনি চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন, মাদকপাচার ও সীমান্ত নিরাপত্তাহীনতার কারণে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবেন। সে অবস্থায় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করে ট্রাম্প তাঁর প্রস্তাবিত প্রাচীর নির্মাণ করবেন। সে কারণে তিনি এরই মধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা সফর করেছেন। তাতেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নি ডেমোক্র্যাটদের। সে কারণেই অনির্দিষ্টকালের এই অচলাবস্থা কিংবা শাট ডাউন। তবে এ অবস্থার জন্য ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছে। আর ২৯ শতাংশ দায়ী করেছে ডেমোক্র্যাটদের।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপনের বিষয়টি নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা অত্যন্ত সঙ্গোপনে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা নিশ্চিত যে রাশিয়ার সঙ্গে মিলে এক গভীর চক্রান্তে সে সাইবার কারসাজি ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গেলে তাঁর তৎকালীন পরিচালক জেমস কমিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মে ২০১৭ সালে বরখাস্ত করেন। কিন্তু তাতেও বিষয়টি সেখানে থেমে থাকেনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সাবেক এফবিআই-প্রধান এবং বিশিষ্ট আইনজীবী রবার্ট মুলারের নেতৃত্বে এক উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিল গঠন করে, যার তদন্ত এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এ তদন্তে শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন পরিচালনা অফিসপ্রধান পল মানাফোর্ট কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত আইনজীবী জেমস কোহেনই নন, পুত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং জামাতা জেরেড কুশনারকেও জবানবন্দি দিতে হয়েছে। মানাফোর্ট ও কোহেন বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা এবং দোষ স্বীকার করেছেন। এরই মধ্যে নিউ ইয়র্কের আদালতে তাঁদের সাজাও হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী চক্রান্ত, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, নারীঘটিত কেলেঙ্কারি ও নির্বাচনী তহবিল নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে পল মানাফোর্ট ও জেমস কোহেন সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে বিভিন্ন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তা ছাড়া নিউ ইয়র্কের ‘ট্রাম্প টাওয়ারে’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার কূটনীতিক বা সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও জামাতা জেরেড কুশনারের বৈঠক নিয়েও তদন্ত হয়েছে। এতে দোষী সাব্যস্ত হলে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁদেরও সাজা হতে পারে। মুলারের বিশেষ কাউন্সিলে যদি ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার কোনো চক্রান্তের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে ট্রাম্পকে আইনগত কারণেই প্রেসিডেন্টের পদ হারাতে হতে পারে। তাতে লণ্ডভণ্ড হবে সবকিছু। সে কারণেই ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত অনেকের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন চাপ সৃষ্টি করার প্রয়াস পেয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম টার্মের প্রথম দুই বছরেই তাঁর হোয়াইট হাউস প্রশাসনের প্রায় সব উপদেষ্টা এবং কর্মকর্তাকে একে একে বিদায় নিতে হয়েছে। আগের কেউ নেই তাঁর সঙ্গে এখন। তাতে এক বিরাট প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি হলেও স্বৈরাচারী শাসকের মতো ট্রাম্প একাই সবকিছু চালানোর মতো মানসিকতা দেখাচ্ছেন। বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হয়েও ট্রাম্প বৈশ্বিক সব ব্যবস্থা, বাণিজ্য ও জোট থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখিয়েছেন। তা ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গত দুই বছরে তাঁর পাঁচটি সাক্ষাৎকারের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত বছর ফিনল্যান্ড ও জার্মানিতে ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে গোপন বৈঠক হয়েছে রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের। সেখানে নোট নেওয়ার জন্য একজন সহকারী ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কূটনীতিক কিংবা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। জার্মানির হামবুর্গের এই সভা দুই ঘণ্টারও বেশি স্থায়ী হয়েছিল বলে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

অনেকেই এখন অভিযোগ করছেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার একজন চর বা এজেন্ট। এ সন্দেহ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়েরও রয়েছে। কিন্তু পদ্ধতিগত সমস্যায় এফবিআই তার কোনো তদন্ত করতে পারছে না।

তবে দক্ষিণপন্থী কিংবা রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলের সঙ্গে সম্পর্কিত ফক্স টেলিভিশন বা নিউজ চ্যানেলের বিশিষ্ট সাংবাদিক জেনিন পাইরো সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন—ট্রাম্প বর্তমানে কিংবা অতীতে রাশিয়ার জন্য কাজ করেছেন কি না! তাতে ট্রাম্প দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, এ ধরনের প্রশ্ন তাঁর জন্য সম্মান হানিকর। খ্যাতনামা মার্কিন সংবাদপত্র ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এ সংবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এসব ঘটনায় আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধসম্পন্ন মার্কিন নাগরিকরা অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। তাঁরা চান ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনা হোক। এবং যুক্তরাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদটি থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে দেওয়া হোক। বিরোধী দল হিসেবে ডেমোক্রেটিক পার্টিও তা-ই চায়। কিন্তু তার জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁকে যেনতেনভাবে সরিয়ে দেওয়া যায় না। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনতে হলে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হয়। তা ছাড়া উচ্চকক্ষ অর্থাৎ সিনেটেও সে প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।

বর্তমান কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫ জন সদস্যের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ২৩৫ জন আর রিপাবলিকানদের রয়েছে ১৯৯ জন। সিনেটে ১০০ সদস্যের মধ্যে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৫৩ জন এবং ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ৪৫ জন। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অভিশংসনের ব্যাপারে রিপাবলিকান সিনেটরদের সমর্থন পাওয়া যাবে না। তবুও ডেমোক্র্যাটরা অভিশংসন প্রস্তাব আনতে চান ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে ১৯৬৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসন এবং ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনা হয়েছিল, কিন্তু সিনেট তা সমর্থন করেনি। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনা হলে ১৯৭৪ সালে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ডেমোক্র্যাটরা তেমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চান। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মানুষ যাঁর কোনো নীতি-নৈতিকতাবোধই নেই, তিনি তাতে পদত্যাগ করবেন বলে মনে হয় না। তাঁকে সরানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হচ্ছে রবার্ট মুলারের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগের উচ্চতর কাউন্সিলের তদন্ত। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর চক্রান্ত কিংবা সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলে ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এ বিষয়টির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ট্রাম্প আবার শেষ পর্যন্ত তাঁকে কোন দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেবেন, তাও বলা যায় না।

উল্লিখিত পরিস্থিতিতে আবার এগিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন। সে কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য চলছে জোর প্রস্তুতি। এ ব্যাপারে ডেমোক্রেটিক শিবির অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কোনো কারণে যদি ট্রাম্প সরে যেতে বাধ্য হন, তাহলে বাকি সময়ের জন্য তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। ২০২০ সালের নির্বাচনের জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টিতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর অভাব নেই। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সুযোগ্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স ও সিনেটর কমলা হ্যারিসসহ রয়েছেন অনেকে। তা ছাড়া নিউ ইয়র্কের সাবেক গভর্নর মাইকেল ব্লুমবার্গের নামও শোনা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। ব্লুমবার্গ মনোনয়ন পেলে নিজের খরচেই নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল ঘাঁটি কিংবা ভরসার ক্ষেত্র হচ্ছে বিশাল যুক্তরাষ্ট্রের শহরতলি ও গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়। এদের শিক্ষাদীক্ষা কিংবা বিত্ত-বেসাত তেমন নেই। তবে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং আমেরিকাকে এক নম্বরে উন্নত করার স্লোগানে উজ্জীবিত। তারা যুক্তরাষ্ট্রে হিসপানিক, লাতিনো, কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা মুসলিমসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের উত্থান দেখতে চায় না। তারা চায় চাকরিবাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সাম্প্রদায়িক কিংবা অভিযুক্ত বর্ণবাদী রাজনীতির মাধ্যমে তাদেরকে অনেকটা সংগঠিত করেছেন। কিন্তু অন্যরা চায় ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়-নির্বিশেষে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমৃদ্ধি। তারা মুক্তবিশ্বের নেতৃত্বে দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্রকে। আরো চায় যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠুক বিশ্বের সব সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত দেশের মানুষের একটি সম্মিলিত আবাস হিসেবে।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

প্রিয় পাঠক, আপনার মূল্যবান শেয়ার / মতামতের এর জন্য ধন্যবাদ।

পাঠকের মতামত