ভোটের ইস্যুতে বিভক্ত বিএনপি

বিএনপি’র অধিকাংশ নেতা-কর্মী মনে করেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক-ভাবেই দলটির কৌশলে ভুল ছিল। তৃণমূল পর্যায়ে অনেকে হতাশ হয়ে পড়লেও এ থেকে বের হবার উপায় খুঁজছে বিএনপি। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর এটা নিয়ে দলের ভেতর-বাইরে বিশ্লেষন চলছে। মুলত: শুরু থেকে বিএনপি বা জোটের কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সেভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। কি প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করবে, কিভাবে সরকার গঠন করবে,কে মূখ্য নেতৃত্বে থাকবেন- তা ছিল ধোঁয়াশার মতো।বিএনপির নেতারা অনেকটা হাত-পা ছেড়ে বসেছিলেন। তারা পুরো নির্ভরতা ছেড়ে দেন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের ওপর।

প্রথমে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবে কি না তা নিয়ে দলে বিভক্তি ছিল স্পষ্ট। এক পক্ষ প্রকাশ্যেই বলতে থাকেন দলের কারাবন্দি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না। নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর গ্রেফতার-হামলা চলতে থাকলে প্রতিকূল পরিবেশের অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের পক্ষে একটি অংশ শক্তভাবে অবস্থান নেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর, কেন্দ্রীয় নেতা নাজিম উদ্দিন আলম, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যনিসহ অনেক নেতা প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জনের পক্ষে অবস্থান নেন। তবে যে কোন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকার পক্ষে ঐক্যফ্রন্টের ড.কামাল হোসেনসহ কয়েকজন নেতার জোরালো অবস্থানের কারনে তা সফল হয়নি।

বিএনপির হাইকমান্ডসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বার বার আহবান জানিয়ে আসছিলেন-ভোট কেন্দ্র পাহারা ও সকালে ভোটের বাক্স পরীক্ষা করবেন নেতা-কর্মীরা। কেন্দ্র ভিত্তিক ভোট রক্ষা কমিটিও করার নির্দেশ দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে। সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে যাবার আহবান জানান ভোটরদের। কিন্তু তা বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে সাড়া মেলেনি। ভোটের কয়েকদিন দিন আগে থেকে ধানের শীষের প্রার্থীরা মাঠ ছেড়ে দেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ অনেকে প্রকাশ্যে ঘোষনা দিয়েই চলে আসেন মাঠের বাইরে। বিএনপির অনেক প্রার্থী প্রচারনায় নামেন নি। এমনকি পোস্টারও ছাপেননি। তাদের প্রচারনা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুলত ফেসবুক কেন্দ্রিক ছিল। তারা আশা করছিলেন ’একটি ভোট সুনামী’ হবে। যেখানে সব মানুষ এসে ধানের শীষে ভোট দিবে।নীরব ভোট বিপ্লব ঘটবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ওদের বেআইনি কোনো আদেশ মানবেন না। ক্ষমতায় তো সরকার ৫ বছর থাকে। সেই ৫ বছর শেষ। আর কয়দিন আছে। মাত্র ১০, ২০ বা ১৫ দিন।

নির্বাচনের দেড় সপ্তাহ আগে ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড.জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ৩০ জানুয়ারি নির্বাচন হবে আর আগামী ২ জানুয়ারি বেগম জিয়া মুিক্ত পাবেন। তিনি বলেন, সকাল ৮ টা থেকে না, ভোর ৫ টা থেকে জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাবেন, সরকারের মৃত্যু ঘন্টা বেজে গেছে্। নৌকা ডুবে যাবে ৩০ তারিখ। তবে বাস্তবে নেতাদের এসব বক্তব্য মাঠে মারা যায়।

বিএনপির কোন কোন নেতা মনে করেন, নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্ব ছিল ঐক্যফ্রন্টের হাতে, যার ‘অপব্যবহার’ হয়েছে। নির্বাচন বর্জনের পক্ষে থাকা নেতারা নির্বাচনে সমতল ক্রীড়াভূমি না থাকা, প্রচারণার ক্ষেত্রে অনিয়ম, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের আচরণে নিরপেক্ষতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেন। এদিকে বিএনপি ভোটের আগের রাতে প্রশাসনের সহায়তায় ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ করে আসলেও কোন প্রমান দেখাতে পারছেন না তারা। নির্বাচনের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটি এবং ঐক্যফ্রন্টের একাধিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে নির্বাচনের পুর্বাপর অবস্থা ও ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষন করেছেন নেতারা। বৈঠকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে থাকা না থাকা নিয়ে বিএনপি নেতারা বিতর্কে জড়ান।

বৈঠকে নির্বাচন বর্জন ইস্যুতে কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ভোটে যাওয়ায় বিএনপির একাংশ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। ভরাডুবির পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের প্রথম বৈঠকে দেখা যায়নি নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধিতা করা অনেক নেতাকে। বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আর কোনো নির্বাচনে এতটা খারাপ ফল হয়নি বিএনপির। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকার আমাদের অবস্থা দুর্বল করেছে। তবে দলের নীতিনির্ধারণেও দূর্বলতা ছিল। তিনি বলেন, রাজনীতি এক-দুই দিনের না। রাজনীতি লম্বা সময়ের। অনেক সময় দেখা যায়, বিশ বছরও ক্ষমতায় আছে কোনো সরকার। তারপরও হতাশ হয়নি বলেই অন্য দল টিকে থাকে। আওয়ামী লীগও ২১ বছর ক্ষমতায় ছিল না। তারা তো ‘অফ হয়ে যায়নি’।

বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আমাদের পুরোনো সব কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। সেই নতুন চিন্তার মধ্যে এই প্রজন্মকে গুরুত্ব দিতে হবে। নেতা-কর্মীদের চেয়েও তাদের মতামত বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পথ নির্দেশনা তৈরি হবে’। ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যত্ এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। আমরা যারা একত্রিত হয়েছিলাম একটা পরিবর্তনের লক্ষ্যে, তা আপ্তবাক্য ছিল না, তা আমাদের ইশতাহারের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে আমাদের আর তাদের মধ্যে পার্থক্য ছিল স্পষ্ট।

এদিকে বিএনপির সাধারণ কর্মীরা ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যত্ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও, ঐক্যফ্রন্টে বিএনপির অবস্থান নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ দেখা গেছে কারো কারো মধ্যে। এমনকি এর ভবিষ্যত্ নিয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছেন না বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারাও।

এদিকে নির্বাচনে চরম ভরাডুবির পর নিজের অবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিএনপি এখন কী কৌশল গ্রহণ করতে যাচ্ছে- তা নিয়েই সব মহলে চলছে আলোচনা-পর্যালোচনা। এক্ষেত্রে দলটি এখন সবার আগে যে কাজটি করতে চায় তা হল- খালেদা জিয়াসহ নেতাকর্মীদের জামিন ও কারামুক্তি। দীর্ঘ ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির নেতারা আগামী দিনের করণীয় নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনাও শুরু করেছেন।

দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, বিএনপির সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতার নিরিখে বিএনপিকে আগামী দিনের পথ চলতে হবে। দল ইতিমধ্যে নির্বাচন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে।একই সঙ্গে নেতারা নতুন নির্বাচনের দাবিও জানিয়েছেন।এ দাবি নিয়ে জনগণের কাছে যাবেন। ভোটের অনিয়ম তদন্তে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছেও যাচ্ছেন তারা। এদিকে ইতিমধ্যে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা তিনটি কর্মসুচী ঘোষনা করেছেন। এছাড়া ভোটে অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে প্রার্থীরা মামলা করবেন। কয়েকটি জেলা সফর করবেন এবং নির্বাচনে পরাজিত দলগুলোর সাথে সংলাপ করবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশের জনপ্রিয় বৃহত্ রাজনৈতিক দল বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে সরকার নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বার বার আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি।তাই সরকার যতই কৌশল গ্রহণ করুক এ দলটিকে ধ্বংস বা নিশ্চিহ্ন করা যাবে না।

সূত্র: ইত্তেফাক

পাঠকের মতামত